১) সময়ের কসম
২) মানুষ আসলে বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে৷
৩) তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং একজন অন্যজনকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে
এ সূরায় একথার ওপর সময়ের কসম খাওয়া হয়েছে যে , মানুষ বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে এবং এই ক্ষতি থেকে একমাত্র তারাই রক্ষা পেয়েছে যারা চারটি গুণাবলীর অধিকারী : (১) ঈমান , (২) সৎকাজ , (৩) পরস্পরকে হকের উপদেশ দেয়া এবং (৪) একে অন্যকে সবর করার উপদেশ দেয়া৷ আল্লাহর এই বাণীর অর্থ সুস্পষ্টভাবে জানার জন্য এখন এখানে প্রতিটি অংশের ওপর পৃথকভাবে চিন্তা - ভাবনা করা উচিত৷
কসম সম্পর্কে ইতিপূর্বে আমি বহুবার সুস্পষ্টভাবে আলোচনা করেছি৷ আল্লাহ সৃষ্টিকুলের কোন বস্তুর শ্রেষ্ঠত্ব , অভিনবত্ব ও বিস্ময়করতার জন্য কখনো তার কসম খাননি৷ বরং যে বিষয়টি প্রমাণ করা উদ্দেশ্যে এই বস্তুটি তার সত্যতা প্রমাণ করে বলেই তার কসম খেয়েছেন৷ কাজেই সময়ের কসমের অর্থ হচ্ছে , যাদের মধ্যে উল্লেখিত চারটি গুণাবলী রয়েছে তারা ছাড়া বাকি সমস্ত মানুষ বিরাট ক্ষতির মধ্যে অবস্থান করছে , সময় এর সাক্ষী৷
সময় মানে বিগত সময় --- অতীত কালও হতে পারে আবার চলতি সময়ও ৷ এই চলতি বা বর্তমান কাল আসলে কোন দীর্ঘ সময়ের নাম নয়৷ বর্তমান কাল প্রতি মুহূর্তে বিগত হচ্ছে এবং অতীতে পরিণত হচ্ছে৷ আবার ভবিষ্যতের গর্ভ থেকে প্রতিটি মুহূর্ত বের হয়ে এসে বর্তমানে পরিণত হচ্ছে এবং বর্তমান থেকে আবার তা অতীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে৷ এখানে যেহেতু কোন বিশেষত্ব ছাড়াই শুধু সময়ের কসম খাওয়া হয়েছে , তাই দুই ধরনের সময় বা কাল এর অন্তরভুক্ত হয়৷ অতীতকালের কসম খাওয়ার মানে হচ্ছে : মানুষের ইতিহাস এর সাক্ষ দিচ্ছে , যারাই এই গুণাবলী বিবর্জিত ছিল তারাই পরিণামে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ আর বর্তমানকালের কসম খাওয়ার অর্থ বুঝতে হলে প্রথমে একথাটি ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে যে , বর্তমানে যে সময়টি অতিবাহিত হচ্ছে সেটি আসলে এমন একটি সময় যা প্রত্যেক ব্যক্তি ও জাতিকে দুনিয়ায় কাজ করার জন্য দেয়া হয়েছে৷ পরীক্ষার হলে একজন ছাত্রকে প্রশ্নপত্রের জবাব দেবার জন্য যে সময় দেয়া হয়ে থাকে তার তুলনা করা যেতে পারে৷ নিজের ঘড়িতে কিছুক্ষণের জন্য সেকেন্ডের কাঁটার চলার গতি লক্ষ করলে এই সময়ের দ্রুত গতিতে অতিবাহিত হবার বিষয়টি উপলব্ধি করা যাবে৷ অথচ একটি সেকেণ্ডও সময়ের একটি বিরাট অংশ৷ একমাত্র একটি সেকেণ্ড আলো এক লাখ ছিয়াশী হাজার মাইলের পথ অতিক্রম করে ৷ এখনো আমরা না জানতে পারলেও আল্লাহর রাজ্যে এমন অনেক জিনিসও থাকতে পারে যা এর চাইতেও দ্রুত গতি সম্পন্ন্ ৷তবুও ঘড়িকে সেকেণ্ডের কাটার চলার যে গতি আমরা দেখি সময়ের চলার গতি যদি তাই ধরে নেয়া হয় এবং যা কিছু ভালো মন্দ কাজ আমরা করি আর যেসব কাজেও আরো ব্যস্ত থাকি সবকিছুই দুনিয়ায় আমাদের কাজ করার জন্য যে সীমিত জীবন কাল দেয়া হয়েছে তার মধ্যেই সংঘটিত হয় , এই দ্রুত অতিবাহিত সময়ই হচ্ছে আমাদের আসল মূলধন৷ ইমাম রাযী এই পর্যায়ে একজন মনীষীর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন৷
তিনি বলেছেন : " একজন বরফওয়ালাদের কাছে থেকে আমি সূরা আসরের অর্থ বুঝেছি৷ সে বাজারে জোর গলায় হেঁকে চলছিল --- দয়া করো এমন এক ব্যক্তির প্রতি যার পূঁজি গলে যাচ্ছে৷ দয়া করো এমন এক ব্যক্তির প্রতি যার পূঁজি গলে যাচ্ছে৷ তার একথা শুনে আমি বললাম, এটিই হচ্ছে আসলে মানুষকে যে আয়ুষ্কাল দেয়া হয়েছে তা বরফ হয়ে যাবার মতো দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে ৷ একে যদি নষ্ট করে ফেলা হয় অথবা ভুল কাজে ব্যয় করা হয় তাহলে সেটিই মানুষের জন্য ক্ষতি৷ "
কাজেই চলমান সময়ের কসম খেয়ে এই সূরায় যে কথা বলা হয়েছে তার অর্থ এই যে , এই দ্রুত গতিশীল সময় সাক্ষ দিচ্ছে , এই চারটি গুণাবলী শূন্য হয়ে মানুষ যে কাজের নিজের জীবন কাল অতিবাহিত করে তার সবটুকুই ক্ষতির সওদা বৈ কিছুই নয়৷ এই চারটি গুণে গুণান্বিত হয়ে যারা দুনিয়ায় কাজ করে একমাত্র তারাই লাভবান হয়৷ এটি ঠিক তেমনি ধরনের একটি কথা যেমন একজন ছাত্র পরীক্ষার হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রশ্ন পত্রের জবাব দেবার পরিবর্তে অন্য কাজে সময় নষ্ট করছে তাকে আমরা হলের দেয়ালে টাঙ্গানো ঘড়ির দিকে অংগুলি নির্দেশ করে বলি : এই দ্রুত গতিশীল সময় বলে দিচ্ছে , তুমি নিজেই ক্ষতি করছো৷ যে ছাত্র এই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত নিজের প্রশ্নপত্রের জবাব দেবার কাজে ব্যয় করছে একমাত্র সেই লাভবান৷
মানুষ শব্দটি একবচন৷ কিন্তু পরের বাক্যে চারটি গুণ সম্পন্ন লোকদেরকে তার থেকে আলাদা করে নেয়া হয়েছে৷ এ কারণে একথটি অবশ্যি মানতে হবে যে , এখানে মানুষ শব্দটি জাতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে৷ ব্যক্তি , জাতি ও সমগ্র মানব সম্প্রদায় এর মধ্যে সমানভাবে শামিল ৷ কাজেই উপরোল্লিখিত চারটি গুণাবলী কোন ব্যক্তি , জাতি বা সারা দুনিয়ার সমস্ত মানুষ যার - ই মধ্যে থাকবে না সে - ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে , এই বিধানটি সর্বাবস্থায় সত্য প্রমাণিত হবে৷ এটি ঠিক তেমনি ধরনের ব্যাপার যেমন আমরা বলি , বিষ মানুষের জন্য ধ্বংসকর ৷ এ ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে , বিষ সর্বাবস্থায় ধবংসকর হবে , এক ব্যক্তি খেলেও , একটি জাতি খেলেও বা সারা দুনিয়ার মানুষেরা সবাই মিলে খেলেও বিষের ধ্বংসকর ও সংহারক গুণ অপরিবর্তনীয়৷ এক ব্যক্তি বিষ খেয়েছে বা একটি জাতি বিষ খেয়েছে অথবা সারা দুনিয়ার সমস্ত মানুষ বিষ খাবার ব্যাপারে একমত হয়ে গেছে , এ দৃষ্টিতে তার মধ্যে গুণগত কোন ফারাক দেখা যাবে না৷ অনুরূপভাবে মানুষের জন্য সূরায় উল্লেখিত চারটি গুণাবলী শূন্য হওয়া যে ক্ষতির কারণ , এটিও একটি অকাট্য সত্য৷ এক ব্যক্তি এই গুণাবলীর শূন্য হোক অথবা কোন জাতি বা সারা দুনিয়ার মানুষেরা কুফরী করা , অসৎকাজ করা এবং পরস্পরকে বাতিল কাজে উৎসাহিত করা ও নফসের বন্দেগী করার উপদেশ দেবার ব্যাপারে একমত হয়ে যাক তাতে এই সার্বজনীন মূলনীতিতে কোন পার্থক্য সৃষ্টি হয় না৷
এখন দেখা যাক ' ক্ষতি ' শব্দটি কুরআন মজীদে কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ আভিধানিক অর্থে ক্ষতি হচ্ছে লাভের বিপরীত শব্দ৷ ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে এ শব্দটির ব্যবহার এমন সময় হয় যখন কোন একটি সদায় লোকসান হয়৷ পুরা ব্যাবসাটায় যখন লোকসান হতে থাকে তখনো এর ব্যবহার হয়৷ আবার সমস্ত পূঁজি লোকসান দিয়ে যখন কোন ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে যায় তখনো এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ কুরআন মজীদ এই একই শব্দকে নিজের বিশেষ পরিভাষায় পরিণত করে কল্যাণ ও সফলতার বিপরীত অর্থে ব্যবহার করছে৷ কুরআনের সাফল্যের ধারণা যেমন নিছক পার্থিব সমৃদ্ধির সমার্থক নয় বরং দুনিয়া থেকে নিয়ে আখেরাত পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত ও যথার্থ সাফল্য এর অন্তরভুক্ত , অনুরূপভাবে তার ক্ষতির ধারণাও নিছক পার্থিব ব্যর্থতা ও দুরবস্থায় সমার্থক নয় বরং দুনিয়া থেকে নিয়ে আখেরাত পর্যন্ত মানুষের সমস্ত যথার্থ ব্যর্থতা ও অসাফল্য এর আওতাভুক্ত হয়ে যায়৷ সাফল্য ও ক্ষতির কুরআনী ধারণার ব্যাখ্যা ইতিপূর্বে আমি বিভিন্ন স্থানে করে এসেছি৷ তাই এখানে আবার তার পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন দেখি না৷ ( দেখুন তাফহীমূল কুরআন , আল ' আরাফ ৯ টীকা , আল আনফাল ৩০ টীকা , ইউনুস ২৩ টীকা , বনি ইসরাঈল ১০২ টীকা , আল হাজ্জ ১৭ টীকা , আল মু'মিনূন ১, ২, ১১ , ও ৫০ টীকা , এবং লোকমান ৪ টীকা আয যুমার ৩৪ টীকা ৷ ) এই সংগে একথাটিও ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে যে , যদিও কুরআনের দৃষ্টিতে আখেরাত মানুষের সাফল্যই তার আসাল সাফল্য এবং আখেরাতে তার ব্যর্থতাই আসল ব্যর্থতা তবুও এই দুনিয়ায় মানুষ যেসব জিনিসকে সাফল্য নামে অভিহিত করেছ তা আসলে সাফল্য নয় বরং এই দুনিয়াতেই তার পরিণাম ক্ষতির আকারে দেখা দিয়েছে এবং যে জিনিসকে মানুষ ক্ষতি মনে করেছে তা আসলে ক্ষতি নয় বরং এই দুনিয়াতেই তা সাফল্যে পরিণত হয়েছে ৷ কুরআন মজীদে বিভিন্ন স্থানে এই সত্যটি বর্ণনা করা হয়েছে৷ যথার্থ স্থানে আমি এর ব্যাখ্যা করে এসেছি৷ ( দেখুন তাফহীমূল কুরআন আন নামল ৯৯ টীকা , মারয়াম ৫৩ টীকা , ত্বা - হা ১০৫ টীকা ) কাজেই কুরআন যখন পূর্ণ বলিষ্ঠতার সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ে ঘোষণা দিচ্ছে , " আসলে মানুষ বিরাট ক্ষতির মধ্যে অবস্থান করছে " তখন এর অর্থ হয় দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানের ক্ষতি৷ আর যখন সে বলে , এই ক্ষতির হাত থেকে একমাত্র তারাই রেহাই পেয়েছে যাদের মধ্যে নিম্নোক্ত চারটি গুণাবলীর সমাবেশ ঘটেছে , তখন এর অর্থ হয় ইহাকাল ও পরকাল উভয় জগতে ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পাওয়া এবং সাফল্য লাভ করা৷
এখন এই সূরার দৃষ্টিতে যে চারটি গুণাবলীর উপস্থিতিতে মানুষ ক্ষতিমুক্ত অবস্থায় থাকতে পারে সে সম্পর্কিত আলোচনায় আসা যাক৷
এর প্রথম গুণটি হচ্ছে ঈমান৷ যদিও এ শব্দটি কুরআন মজীদের কোন কোন স্থানে নিছক মৌখিক স্বীকারোক্তির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ( যেমন আন নিসা ১৩৭ আয়াত , আল মায়েদাহ ৫৪ আয়াত , আল আনফাল ২০ ও ২৭ আয়াত , আত তাওবা ৩৮ আয়াত এবং আসসাফ ২ আয়াত ) তবুও আসল ব্যবহার হয়েছে সাচ্চা দিলে মেনে নেয়া ও বিশ্বাস করা অর্থে ৷
" মু'মিন তো আসলে তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনে আর তারপর সংশয়ে লিপ্ত হয় না৷ " ( আল হুজুরাত ১৫ )
" যারা বলেছে , আল্লাহ আমাদের রব আর তারপর তার ওপর অবিচল হয়ে গেছে ৷ " ( হা-মীম আস সাজদাহ ৩০ )
" আসলে তারাই মু'মিন , আল্লাহর কথা উচ্চারিত হলে যাদের দিল কেঁপে ওঠে৷ ( আনফাল ২ )
" যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ও অত্যন্ত মজবুতির সাথে ভালোবাসে ৷ "
" কাজেই , না ( হে নবী ! ) তোমার রবের কসম , তারা কখনোই মু'মিন নয় , যতক্ষণ না তাদের পারস্পরিক বিরোধে তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে না মেনে নেয়৷ তারপর যা কিছু তুমি ফায়সালা করো সে ব্যাপারে তারা মনে কোন প্রকার সংকীর্ণতা অনুভব করে না বরং মনে প্রাণে মেনে নেয়৷ " ( আন নিসা ৬৫ )
নিম্নোক্ত আয়াতটিতে ঈমানের মৌখিক স্বীকারোক্তি ও প্রকৃত ঈমানের মধ্যে পার্থক্য আরো বেশী করে প্রকাশ করা হয়েছে৷ এখানে বলা হয়েছে আসল লক্ষ হচ্ছে প্রকৃত ঈমান , মৌখিক স্বীকারোক্তি নয় :
হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনো ৷ " ( আন নিসা ১৩৬ আয়াত )
এখন প্রশ্ন দেখা দেয় , ঈমান আনা বলতে কিসের ওপর ঈমান আনা বুঝাচ্ছে ? এর জবাবে বলা যায় , কুরআন মজীদে একথাটি একবারে সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে৷ প্রথমত আল্লাহকে মানা ৷ নিছক তাঁর অস্তিত্ব মেনে নেয়া নয়৷ বরং তাঁকে এমনভাবে মানা যাতে বুঝা যায় যে , তিনি একমাত্র প্রভু ও ইলাহ৷ তাঁর সর্বময় কর্তৃত্বে কোন অংশীদার নেই৷ একমাত্র তিনিই মানুষের ইবাদাত , বন্দেগী ও আনুগত্য লাভের অধিকারী৷ তিনিই ভাগ্য গড়েন ও ভাঙেন৷ বান্দার একমাত্র তাঁরই কাছে প্রার্থনা এবং তাঁরই ওপর নির্ভর করা উচিত৷ তিনিই হুকুম দেন ও তিনিই নিষেধ করেন৷ তিনি যে কাজের হুকুম দেন তা করা ও যে কাজ থেকে বিরত রাখতে চান তা না করা বান্দার ওপর ফরয ৷ তিনি সবকিছু দেখেন ও শোনেন৷ মানুষের কোন কাজ তাঁর দৃষ্টির আড়ালে থাকা তো দূরের কথা , যে উদ্দেশ্যে ও নিয়তের ভিত্তিতে মানুষে কাজটি করে তাও তাঁর অগোচরে থাকে না৷ দ্বিতীয়ত রসূলকে মানা৷ তাঁকে আল্লাহর নিযুক্ত পথপ্রদর্শক ও নেতৃত্বদানকারী হিসেবে মানা৷ তিনি যা কিছু শিক্ষা দিয়েছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে দিয়েছেন , তা সবই সত্য এবং অবশ্যি গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেয়া ৷ ফেরেশতা , অন্যান্য নবীগণ , আল্লাহর কিতাবসমূহ এবং কুরআনের প্রতি ঈমান আনাও এই রসূলের প্রতি ঈমান আনার অন্তরভুক্ত ৷ কারণ আল্লাহর রসূলেই এই শিক্ষাগুলো দিয়েছেন৷ তৃতীয়ত আখেরাতকে মানা৷ মানুষের এই বর্তমান জীবনটিই প্রথম ও শেষ নয় , বরং মৃত্যুর পর মানুষকে পুনরায় জীবিত হয়ে উঠতে হবে , নিজের এই দুনিয়ার জীবনে সে যা কিছু কাজ করেছে আল্লাহর সামনে তার জবাবদিহি করতে হবে এবং হিসেব - নিকেশে যেসব লোক সৎ গণ্য হবে তাদেরকে পুরস্কৃত করা হবে এবং যারা অসৎ গণ্য হবে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে , এই অর্থে আখেরাতকে মেনে নেয়া ৷ ঈমান , নৈতিক চরিত্র ও জীবনের সমগ্র কর্মকাণ্ডের জন্য এটি একটি মজবুত বুনিয়াদ সরবরাহ করে৷ এর ওপর একটি পাক - পবিত্র জীবনের ইমারত গড়ে উঠতে পারে ৷ নয়তো যেখানে আদতে ঈমানের অস্তিত্বই নেই সেখানে মানুষের জীবন যতই সৌন্দর্য বিভূষিত হোক না কেন তার অবস্থা একটি নোঙ্গর বিহীন জাহাজের মতো৷ এই জাহাজ ঢেউয়ের সাথে ভেসে যেতে থাকে এবং কোথাও স্থায়ীভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না৷
ঈমানের পরে মানুষকে ক্ষতি থেকে বাঁচাবার জন্য দ্বিতীয় যে গুণীট অপরিহার্য সেটি হচ্ছে সৎকাজ৷ কুরআনের পরিভাষায় একে বলা হয় সালেহাত৷ সমস্ত সৎকাজ এর অন্তরভুক্ত ৷ কোন ধরনের সৎকাজ ও সৎবৃত্তি এর বাইরে থাকে না৷ কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে যে কাজের মূলে ঈমান নেই এবং যা আল্লাহ ও তাঁর রসূল প্রদত্ত হেদায়াতের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়নি তা কখনো ' সালেহাত ' তথা সৎকাজের অন্তরভুক্ত হতে পারে না৷ তাই কুরআন মজীদের সর্বত্র সৎকাজের আগে ঈমানের কথা বলা হয়েছে এবং এই সূরায়ও ঈমানের পরেই এর কথা বলা হয়েছে৷ কুরআনের কোন এক জায়গায়ও ঈমানে ছাড়া সৎকাজের কথা বলা হয়নি এবং কোথাও ঈমান বিহীন কোন কাজের পুরস্কার দেবার আশ্বাসও দেয়া হয়নি৷ অন্যদিকে মানুষ নিজের কাজের সাহায্যে যে ঈমানের সত্যতা প্রমান পেশ করে সেটিই হয় নির্ভরযোগ্য ও কল্যাণকর ঈমান ৷ অন্যথায় সৎকাজ বিহীন ঈমান একটি দাবী ছাড়া আর কিছুই নয়৷ মানুষ এই দাবী সত্ত্বেও যখন আল্লাহ ওতাঁর রসূল নির্দেশিত পথ ছেড়ে অন্য পথে চলে তখন আসলে সে নিজেই তার এই দাবীর প্রতিবাদ করে৷ ঈমান ও সৎকাজের সম্পর্কে বীজ ও বৃক্ষের মতো৷ বীজ মাটির মধ্যে না থাকা পর্যন্ত কোন বৃক্ষ জন্মাতে পারে না৷ কিন্তু যদি বীজ মাটির মধ্যে থাকে এবং কোন বৃক্ষ না জন্মায় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় মাটির বুকে বীজের সমাধি রচিত হয়ে গেছে৷ এজন্য কুরআন মজীদে যতগুলো সুসংবাদ দেয়া হয়েছে তা এমন সব লোকদেরকে দেয়া হয়েছে যারা ঈমান এনে সৎকাজ করে৷ এই সূরায়ও একথাটিই বলা হয়েছে৷ এখানে বলা হয়েছে , মানুষকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য দ্বিতীয় যে গুণটির অপরিহার্য প্রয়োজন সেটি হচ্ছে ঈমান আনার পর সৎকাজ করা ৷ অন্য কথায় , সৎকাজ ছাড়া নিছক ঈমান মানুষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না৷
উপরোক্ত গুণগুলো তো ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে থাকতে হবে৷ এরপর এ সূরাটি আরো দু'টি বাড়টি গুণের কথা বলে৷ ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য এ গুণ দু'টি থাকা জরুরী ৷ এ গুণ দু'টি হচ্ছে , যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের পরস্পরকে হক কথা বলার ও হক কাজ করার এবং ধৈর্যের পথ অবলম্বন করার উপদেশ দিতে হবে৷ এর অর্থ হচ্ছে , প্রথমত ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের পৃথক পৃথক ব্যক্তি হিসেবে অবস্থান না করা উচিত৷ বরং তাদের সম্মিলিত একটি মু'মিন ও সৎ সমাজদেহ গড়ে উঠতে হবে৷ দ্বিতীয়ত এই সমাজ যাতে বিকৃত না হয়ে যায় সে দায়িত্ব সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিকে উপলব্ধি করতে হবে৷ এ জন্য এই সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি অন্যকে হক পথ অবলম্বন ও সবর করার উপদেশ দেবে , এটা তাদের সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য৷
হক শব্দটি বাতিলের বিপরীত৷ সাধারণত এ শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে৷ এক : সঠিক , নির্ভুল , সত্য , ন্যায় ও ইনসাফ অনুসারী এবং আকীদা ও ঈমান বা পার্থিব বিষয়াদির সাথে সম্পর্কিত প্রকৃত সত্য অনুসারী কথা ৷ দুই : আল্লাহর , বান্দার বা নিজের যে হকটি আদায় করা মানুষের জন্য ওয়াজিব হয়ে থাকে৷ কাজেই পরস্পরকে হকের উপদেশ দেবার অর্থ হচ্ছে , ঈমানদারদের এই সামাজটি এমনি অনুভূতিহীন নয় যে , এখানে বাতিল মাথা উঁচু করতে এবং হকের বিরুদ্ধে কাজ করে যেতে থাকলেও লোকেরা তার নীরব দর্শক হয় মাত্র ৷ বরং যখন ও যেখানেই বাতিল মাথা উঁচু করে তখনই সেখানে হকের আওয়াজ বুলন্দকারীরা তার মোকাবেলায় এগিয়ে আসে , এই সমাজে এই প্রাণশক্তি সর্বক্ষণ প্রবাহিত থাকে৷ সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেই কেবল সত্যপ্রীতি ও সত্য নীতিও ন্যায় নিষ্ঠার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে না এবং হকদারদের হক আদায় করেই ক্ষান্ত হয় না বরং অন্যদেরকে এই কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করার উপদেশ দেয়৷ এই জিনিসটিই সমাজকে নৈতিক পতন ও অবক্ষয় থেকে রক্ষা করার জামানত দেয়৷ যদি কোন সমাজে এই প্রাণ শক্তি না থাকে তাহলে সে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে পারবে না৷ যারা নিজেদের জায়গায় হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে কিন্তু নিজেদের সমাজে হককে বিধ্বস্ত হতে দেখে নিরব থাকবে তারাও একদিন এই ক্ষতিতে লিপ্ত হবে৷ একথাটিই সূরা মায়েদায় বলা হয়েছে৷ সেখানে বলা হয়েছে : হযরত দাউদ ও হযরত ঈসা ইবনে মারয়ামের মুখ দিয়ে বনি ইসরাঈলদের ওপর লানত করা হয়েছে৷ আর এই লানতের কারণ ছিল এই যে, তাদের সামজে গোনাহ ও জুলুম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং লোকেরা পরস্পরকে খারাপ কাজে বাধা দেয়া থেকে বিরত থেকেছিল ( ৭৮-৭৯ আয়াত ) আবার একথাটি সূরা আরাফে এভাবে বলা হয়েছে : বনী ইসরাঈলরা যখন প্রকাশ্যে শনিবারের বিধান অমান্য করে মাছ ধরতে শুরু করে তখন তাদের ওপর আযাব নাযিল করা হয় এবং সেই আযাব থেকে একমাত্র তাদেরকেই বাঁচানো হয় যারা লোকেদেরকে এই গোনাহর কাজে বাধা দেবার চেষ্টা করতো৷ ( ১৬৩- ১৬৬ আয়াত ) সুরা আনফালে আবার একথাটি এভাবে বলা হেয়েছে : সেই ফিতনাটি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করো যার ক্ষতিকর প্রভাব বিশেষভাবে শুধুমাত্র সেসব লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না যারা তোমাদের মধ্যে গোনাহ করেছে৷ ( ২৫ আয়াত ) --- এ জন্যই সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখাকে উম্মতে মুসলিমার দায়িত্ব ও কর্তব্য গণ্য করা হয়েছে৷ ( আলে ইমরান ১০৪ ) সেই উম্মাতকে সর্বোত্তম উম্মাত বলা হয়েছে , যারা এই দায়িত্ব পালন করে ৷ ( আলে ইমরান ১১০ )
হকের নসিহত করার সাথে দ্বিতীয় যে জিনিসটিকে ঈমানদারগণকে ও তাদের সমাজের ক্ষতি থেকে বাচাঁর জন্য অপরির্হায শর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে ,এই সমাজের ব্যক্তিবর্গ পরস্পরকে সবর করার উপদেশ দিতে থাকবে ৷অর্থাৎ হককে সমর্থন করতে ও তার অনুসারী হতে গিয়ে যেসব সমস্যা ও বাধা - বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় এবং এপথে যেসব কষ্ট ,পরিশ্রম ,বিপদ - আপদ ক্ষতি ও বঞ্চনা মানুষকে নিরন্তর পীড়িত করে তার মোকাবেলায় তারা পরস্পরকে অবিচল ও দৃঢ়পদ থাকার উপদেশ দিতে থাকবে ৷ সবরের সাথে কিছু বরদাশত করার জন্য তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি অন্যকে সাহস যোগাতে থাকবে ৷( দেখুন তাফহীমূল কুরআন ,আদ দাহর ১৬ টীকা এবং আল বালাদ ১৪ টীকা ) ৷
৬৮) লোকেরা বলে, আল্লাহ কাউকে পুত্র বানিয়েছেন৷ *৬৬ সুবহানাল্লাহ -তিনি মহান-পবিত্র! *৬৭ তিনি তো অভাবমুক্ত৷ আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার মালিকানাধীন৷ *৬৮ একথার সপক্ষে তোমাদের কাছে কি প্রমাণ আছে? তোমরা কি আল্লাহর সপক্ষে এমন সব কথা বলো যা তোমাদের জানা নেই?
__________________________ ___________
*৬৬ . ওপরের আয়াতগুলোতে মানুষের জাহেলী ধ্যান-ধারণা ও মূর্খতার সমালোচনা করা হয়েছিল৷ সেখানে বলা হয়েছিল , তোমরা নিজেদের ধর্মের ভিত রাখো প্রত্যয় মিশ্রিত জ্ঞানের পরিবর্তে আন্দাজ ও অনুমানের ওপর৷ তারপর যে ধর্মের অনুসারী হয়ে তোমরা এগিয়ে যাও তার পেছনে কোন যুক্তি প্রমাণ আছে কি না, কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এ মর্মে অনুসন্ধান করার কোন চেষ্টাই করো না৷ এখন এ প্রসংগে খৃষ্টান ও অন্যান্য কতিপয় ধর্মাবলম্বীদের এ অজ্ঞতার সমালোচনা এ বলে করা হয়েছে যে, তারা নিছক আন্দাজ -অনুমানের ভিত্তিতে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে নিয়েছে৷
__________________________ ___________
*৬৭ . সুবহানাল্লাহ শব্দটি কখনো বিস্ময় প্রকাশ করার জন্য বলা হয় আবার কখনো এর আসল অর্থেও ব্যবহৃদ হয়৷ অর্থাৎ আল্লাহ সকল দোষ-ত্রুটি মুক্ত৷ এখানে এ শব্দটি থেকে এ উভয় অর্থই প্রকাশ হচ্ছে৷ লোকেরা যে কথা বলছে তার ওপর একদিকে বিস্ময় প্রকাশ করাও যেমন উদ্দেশ্য, তেমনি অন্যদিকে এ মর্মে তাদের জবাব দেয়াও উদ্দেশ্য যে, আল্লাহ তো ত্রুটিমুক্ত, কাজেই তার সন্তান আছে একথা বলা কেমন করে সঠিক হতে পারে!
__________________________ ___________
*৬৮ . এখানে তাদের এ বক্তব্যের প্রতিবাদ তিনটি কথা বলা হয়েছে৷ এক, আল্লাহ ত্রুটিমুক্ত৷ দুই, তার কোন অভাব নেই, তিনি কারোর মুখাপেক্ষী নন৷ তিন, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত বস্তুই তার মালিকানাধীন সামান্য একটু ব্যাখ্যা করলে এ সংক্ষিপ্ত জবাবটি সহজেই অনুধাবন করা যেতে পারেঃ
পুত্র দুই রকমের হতে পারে৷ ঔরসজাত অথবা পালিত৷ তারা যদি কাউকে ঔরসজাত অর্থে আল্লাহর পুত্র গণ্য করে তাহলে এর মানে হবে যে, তারা আল্লাহকে এমন এক জীবের মত মনে করে, যে স্বভাব -প্রকৃতির দিক দিয়ে মরণশীল এবং যার অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য তার কোন স্বজাতি থাকতে হবে আবার এ স্বজাতি থেকে তার একজন স্ত্রী হতে হবে এবং তাদের দুজনের যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে তার সন্তান উৎপন্ন হবে৷ এ সন্তান তার প্রজাতীয় সত্তা এবং তার কাজ টিকিয়ে রাখবে৷ এ ছাড়া তার অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা হতে পারে না৷ আর যদি কাউকে দত্তক অর্থে আল্লাহর পুত্র গণ্য করে তাহলে এর দুটি অর্থ হবে৷ এক, তারা আল্লাহকে এমন এক মানুষের মতো মনে করে, যে নিসন্তান হবাব কারণে নিজের উত্তারাধিকারী করার এবং সন্তানহীনতার দরুণ তার যে ক্ষতি হচ্ছে নামমাত্র হলেও তার কিছুটা প্রতিকার করার উদ্দেশ্য নিজের প্রজাতির কোন একজনকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে ৷ দুই, তারা মনে করে আল্লাহ ও মানবিক আবেগের অধিকারী৷ এ কারণে নিজের অসংখ্য বান্দাদের মধ্য থেকে কোন একজনের প্রতি তার স্নেহ ভালোবাসা এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে যে, তাকে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন৷
এ তিনটি অবস্থার যে কোনটিই সঠিক হোক না কেন, সর্বাবস্থায়ই এ বিশ্বাসের মৌল তত্ত্বের মধ্যে আল্লাহর প্রতি আরোপিত হবে বহু দোষ-ত্রুটি ,দুর্বলতা ও অভাব ৷ এ কারণে প্রথমে বাক্যাংশে বলা হয়েছে তোমরা আল্লাহর ওপর যেসব দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা আরোপ করছো সেসব থেকে তিনি মুক্ত৷ দ্বিতীয় বাক্যাংশে বলা হয়েছে , তিনি এমন ধরনের অভাব থেকেও মুক্ত যার কারণে মরণশীল মানুষেদের সন্তানদের দত্তক নেবার প্রয়োজন হয়৷ তৃতীয় বাকাংশে পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে যে পৃথিবীতে ও আকাশে সবাই আল্লাহর বান্দা ও তার দাস৷ তাদের কারোর সাথে আল্লাহর এমন কোন বিশেষ বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই যার ফলে সবাইকে বাদ দিয়ে তিনি তাকেই নিজের পুত্র বা একমাত্র পুত্র অথবা উত্তরাধিকারী মানোনীতি করবেন৷ বান্দার গুণের কারণে অবশ্যি আল্লাহ একজনের তুলনায় আর একজনকে বেশী ভালোবাসেন৷ কিন্তু এ ভালবাসার অর্থ এ নয় যে, কোন বান্দাকে বন্দেগী পর্যায় থেকে উঠেয়ে নিয়ে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অংশীদার করার পর্যায়ে উন্নীত করবেন৷ বড়জোর এ ভালোবাসার দাবী ততটুকুই হতে পারে যা এর আগের একটি আয়াত বলা হয়েছে৷ সেখনে বলা হয়েছেঃ যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করেছে তাদের কোন ভয় ও মর্মযাতনা নেই৷ দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই তাদের জন্য আছে শুধু সুসংবাদ৷
.
__________________________ ___________
৬৯) হে মুহাম্মাদ ! বলো, যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তারা কখনো সফলকাম হতে পারে না৷
.
__________________________ ___________
৭০) দুনিয়ার দুদিনের জীবন ভোগ করে নাও, তারপর আমার দিকে তাদের ফিরে আসতে হবে, তখন তারা যে কুফরী করছে তার প্রতিফল স্বরূপ তাদেরকে কঠোর শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো৷
.
__________________________ ___________
__________________________
*৬৬ . ওপরের আয়াতগুলোতে মানুষের জাহেলী ধ্যান-ধারণা ও মূর্খতার সমালোচনা করা হয়েছিল৷ সেখানে বলা হয়েছিল , তোমরা নিজেদের ধর্মের ভিত রাখো প্রত্যয় মিশ্রিত জ্ঞানের পরিবর্তে আন্দাজ ও অনুমানের ওপর৷ তারপর যে ধর্মের অনুসারী হয়ে তোমরা এগিয়ে যাও তার পেছনে কোন যুক্তি প্রমাণ আছে কি না, কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এ মর্মে অনুসন্ধান করার কোন চেষ্টাই করো না৷ এখন এ প্রসংগে খৃষ্টান ও অন্যান্য কতিপয় ধর্মাবলম্বীদের এ অজ্ঞতার সমালোচনা এ বলে করা হয়েছে যে, তারা নিছক আন্দাজ -অনুমানের ভিত্তিতে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে নিয়েছে৷
__________________________
*৬৭ . সুবহানাল্লাহ শব্দটি কখনো বিস্ময় প্রকাশ করার জন্য বলা হয় আবার কখনো এর আসল অর্থেও ব্যবহৃদ হয়৷ অর্থাৎ আল্লাহ সকল দোষ-ত্রুটি মুক্ত৷ এখানে এ শব্দটি থেকে এ উভয় অর্থই প্রকাশ হচ্ছে৷ লোকেরা যে কথা বলছে তার ওপর একদিকে বিস্ময় প্রকাশ করাও যেমন উদ্দেশ্য, তেমনি অন্যদিকে এ মর্মে তাদের জবাব দেয়াও উদ্দেশ্য যে, আল্লাহ তো ত্রুটিমুক্ত, কাজেই তার সন্তান আছে একথা বলা কেমন করে সঠিক হতে পারে!
__________________________
*৬৮ . এখানে তাদের এ বক্তব্যের প্রতিবাদ তিনটি কথা বলা হয়েছে৷ এক, আল্লাহ ত্রুটিমুক্ত৷ দুই, তার কোন অভাব নেই, তিনি কারোর মুখাপেক্ষী নন৷ তিন, আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত বস্তুই তার মালিকানাধীন সামান্য একটু ব্যাখ্যা করলে এ সংক্ষিপ্ত জবাবটি সহজেই অনুধাবন করা যেতে পারেঃ
পুত্র দুই রকমের হতে পারে৷ ঔরসজাত অথবা পালিত৷ তারা যদি কাউকে ঔরসজাত অর্থে আল্লাহর পুত্র গণ্য করে তাহলে এর মানে হবে যে, তারা আল্লাহকে এমন এক জীবের মত মনে করে, যে স্বভাব -প্রকৃতির দিক দিয়ে মরণশীল এবং যার অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য তার কোন স্বজাতি থাকতে হবে আবার এ স্বজাতি থেকে তার একজন স্ত্রী হতে হবে এবং তাদের দুজনের যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে তার সন্তান উৎপন্ন হবে৷ এ সন্তান তার প্রজাতীয় সত্তা এবং তার কাজ টিকিয়ে রাখবে৷ এ ছাড়া তার অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা হতে পারে না৷ আর যদি কাউকে দত্তক অর্থে আল্লাহর পুত্র গণ্য করে তাহলে এর দুটি অর্থ হবে৷ এক, তারা আল্লাহকে এমন এক মানুষের মতো মনে করে, যে নিসন্তান হবাব কারণে নিজের উত্তারাধিকারী করার এবং সন্তানহীনতার দরুণ তার যে ক্ষতি হচ্ছে নামমাত্র হলেও তার কিছুটা প্রতিকার করার উদ্দেশ্য নিজের প্রজাতির কোন একজনকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে ৷ দুই, তারা মনে করে আল্লাহ ও মানবিক আবেগের অধিকারী৷ এ কারণে নিজের অসংখ্য বান্দাদের মধ্য থেকে কোন একজনের প্রতি তার স্নেহ ভালোবাসা এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে যে, তাকে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন৷
এ তিনটি অবস্থার যে কোনটিই সঠিক হোক না কেন, সর্বাবস্থায়ই এ বিশ্বাসের মৌল তত্ত্বের মধ্যে আল্লাহর প্রতি আরোপিত হবে বহু দোষ-ত্রুটি ,দুর্বলতা ও অভাব ৷ এ কারণে প্রথমে বাক্যাংশে বলা হয়েছে তোমরা আল্লাহর ওপর যেসব দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা আরোপ করছো সেসব থেকে তিনি মুক্ত৷ দ্বিতীয় বাক্যাংশে বলা হয়েছে , তিনি এমন ধরনের অভাব থেকেও মুক্ত যার কারণে মরণশীল মানুষেদের সন্তানদের দত্তক নেবার প্রয়োজন হয়৷ তৃতীয় বাকাংশে পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে যে পৃথিবীতে ও আকাশে সবাই আল্লাহর বান্দা ও তার দাস৷ তাদের কারোর সাথে আল্লাহর এমন কোন বিশেষ বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই যার ফলে সবাইকে বাদ দিয়ে তিনি তাকেই নিজের পুত্র বা একমাত্র পুত্র অথবা উত্তরাধিকারী মানোনীতি করবেন৷ বান্দার গুণের কারণে অবশ্যি আল্লাহ একজনের তুলনায় আর একজনকে বেশী ভালোবাসেন৷ কিন্তু এ ভালবাসার অর্থ এ নয় যে, কোন বান্দাকে বন্দেগী পর্যায় থেকে উঠেয়ে নিয়ে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অংশীদার করার পর্যায়ে উন্নীত করবেন৷ বড়জোর এ ভালোবাসার দাবী ততটুকুই হতে পারে যা এর আগের একটি আয়াত বলা হয়েছে৷ সেখনে বলা হয়েছেঃ যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করেছে তাদের কোন ভয় ও মর্মযাতনা নেই৷ দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই তাদের জন্য আছে শুধু সুসংবাদ৷
.
__________________________
৬৯) হে মুহাম্মাদ ! বলো, যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তারা কখনো সফলকাম হতে পারে না৷
.
__________________________
৭০) দুনিয়ার দুদিনের জীবন ভোগ করে নাও, তারপর আমার দিকে তাদের ফিরে আসতে হবে, তখন তারা যে কুফরী করছে তার প্রতিফল স্বরূপ তাদেরকে কঠোর শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো৷
.
__________________________
৫৫) অবশ্যি আল্লাহর কাছে যমিনের ওপর বিচরনশীল জীবের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে তারাই যারা সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে৷ তারপর তারা আর কোন মতেই তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়৷ __________________________ ________________________
৫৬) বিশেষ করে তাদের মধ্যে থেকে এমন সব লোক যাদের সাথে তুমি চুক্তি করছো তারপর তারা প্রত্যেকবার তা ভংগ করে এবং একটুও আল্লাহর ভয় করে না৷ *৪১
__________________________ ________________________
*৪১ . এখানে বিশেষভাবে ইহুদীদের প্রতি ইশারা করা হয়েছে৷ মদীনা তাইয়েবায় আসার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম তাদের সাথেই সৎ প্রতিবেশী সূলভ জীবন যাপন ও পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার চুক্তি করেছিলেন ৷ তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্যে তিনি নিজের সামর্থ অনুযায়ী পূর্ণ প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন৷ তাছাড়া ধর্মীয় দিক দিয়েও তিনি ইহুদীদেরকে মুশরিকদের তুলনায় নিজের অনেক কাছের মনে করতেন, প্রত্যেক ব্যাপারেই তিনি মুশরিকদের মোকাবিলায় আহলি কিতাবদের মত ও পথকে অগ্রাধিকার দিতেন৷ কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ভেজাল তাওহীদ ও সৎ চরিত্র নীতি সংক্রান্ত যেসব কথা প্রচার করে চলছিলেন , বিশ্বাস ও কর্মের গোমরাহীর বিরুদ্ধে যে সমালোচনা করে চলছিলেন এবং সত্য দীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যে প্রচেষ্ঠা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন ইহুদীদের উলামা ও মাশায়েখ গোষ্ঠী তা একটুও পছন্দ করতে না৷ এ নতুন আন্দোলন যাতে কোনভাবেই সাফল্য লাভ করতে না পারে সে জন্যে তারা অনবরত ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিল৷ এ উদ্দেশ্যে তারা মদীনার মুনাফিক মুসলমানদের সাথে মিলে চক্রান্ত করে চলছিল৷এ উদ্দেশ্যেই তারা আওস ও খাযরাজ বংশীয় লোকদের যেসব পুরাতন শত্রুতা ইসলাম পূর্বযুগে তাদের মধ্যে খুনাখুনি ও হানাহানির কারণ হতো সেগুলোকে উৎসাহিত ও উত্তেজিত করতো৷ এ উদ্দেশ্যেই কুরাইশ ও অন্যান্য ইসলাম বিরোধী গোত্রগুলোর সাথে তাদের গোপন যোগসাজস চলছিল৷ নবী (সা) ও তাদের মধ্যে যে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তা সত্ত্বেও এসব কাজ করে চলছিল৷ যখন বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হলো, শুরুতে তারা আশা করেছিল, কুরাইশদের প্রথম আঘাতেই এই আন্দোলনের মৃত্যু ঘন্টা বেজে উঠবে৷ কিন্তু ফলাফল দেখা গেলো তাদের প্রত্যাশার বিপরীত ৷ এ অবস্থায় তাদের অন্তরে আরো বেশী করে জ্বলে উঠলো হিংসার আগুন৷ বদরের বিজয় যাতে ইসলামের শক্তিতে একটি স্থায়ী বিপদে পরিণত না করে দেয় এ আশংকায় তারা নিজেদের বিরোধামূলক প্রচেষ্টা আরো বেশী জোরদার করে দিল৷ এমনকি একজন নেতা কা'ব ইবনে আশরাফ(কুরাইশদের পরাজয়ের খবর শুনে যে ব্যক্তি চিৎকার করে বলে উঠেছিল,আজ যমীনের পেট তার পিঠের চেয়ে আমাদের জন্যে অনেক ভাল)নিজে মক্কা গেলো৷ সেখানে সে উদ্দীপনাময় শোক গীতি গেয়ে কুরাইশদের অন্তরে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগিয়ে তুলতে থাকলো৷ এখানেই তারা ক্ষান্ত হলো না৷ ইহুদীদের বনী কাইনুকা গোত্র সৎ প্রতিবেশী সূলভ বসবাসের চুক্তি ভংগ করে তাদের জনবসতিতে যেসব মুসলমান মেয়ে কোন কাজে যেতো তাদেরকে উত্যক্ত ও উৎপীড়ন করতে শুরু করলো৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাদের এ অন্যায় কার্যকলাপের জন্যে তাদের তিরস্কার করলেন তখন তারা জবাবে হুমকি দিলঃ "আমাদের মক্কার কুরাইশ মনে করো না৷ আমরা যুদ্ধ করতেও যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণ দিতে জানি৷ আমাদের মোকাবিলায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে নামলে তোমরা টের পাবে, পুরুষ কাকে বলে ৷"
__________________________ ________________________
৫৭) কাজেই এ লোকদের যদি তোমরা যুদ্ধের মধ্যে পাও তাহলে তাদের এমনভাবে মার দেবে যেন তাদের পরে অন্য যারা এমনি ধরনের আচরণ করতে চাইবে তারা দিশা হারিয়ে ফেলে৷ *৪২ আশা করা যায় ,চুক্তি ভংগকারীদের এ পরিণাম থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করবে৷
__________________________ ________________________
*৪২ . এর অর্থ হচ্ছে, যদি কোন জাতির সাথে আমাদের চুক্তি হয়, তারপর তারা নিজেদের চুক্তির দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে আমরাও চুক্তির নৈতিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবো৷ এ ক্ষেত্রে আমরাও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ন্যায়সংগত অধিকার লাভ করবো৷ তাছাড়া যদি কোন জাতির সাথে আমাদের যুদ্ধ চলতে থাকে এবং আমরা দেখি ,শত্রুপক্ষের সাথে এমন এক সম্প্রদায়ের লোকরাও যুদ্ধে শামিল হয়েছে যাদের সাথে আমাদের চুক্তি রয়েছে তাহলে আমরা তাদেরকে হত্যা করতে এবং তাদের সাথে শত্রুর মত ব্যবহার করতে একটুও দ্বিধা করবো না৷কারণ তারা ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের সম্প্রদায়ের চুক্তি ভংগ করে তাদের ধন-প্রাণের নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের সম্প্রদায়ের সাথে আমাদের যে চুক্তি রয়েছে তা লংঘন করেছে৷ ফলে নিজেদের নিরাপত্তার অধিকার তারা প্রমাণ করতে পারেনি৷
__________________________ ________________________
৫৮) আর যদি কখনো কোন জাতির পক্ষ থেকে তোমাদের খেয়ানত আশংকা থাকে তাহলে তার চুক্তি প্রকাশ্যে তার সামনে ছুড়ে দাও৷ *৪৩ নিসন্দেহে আল্লাহ খেয়ানতকারীকে পছন্দ করেন না৷
__________________________ ________________________
*৪৩ . এ আয়াতের দৃষ্টিতে যদি কোন ব্যক্তি,দল বা দেশের সাথে আমাদের চুক্তি থাকে এবং তার কর্মনীতি আমাদের মনে তার বিরুদ্ধে চুক্তি মেনে চলার ব্যাপারে গড়িমসি করার অভিযোগ সৃষ্টি করে অথবা সুযোগ পেলেই সে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে এ ধরনের আশংকা দেখা দেয়, তাহলে আমাদের পক্ষে একতরফাভাবে এমন সিদ্ধান্ত হঠাৎ কোনক্রমেই বৈধ নয় যে, আমাদের ও তার মধ্যে কোন চুক্তি নেই৷ আর এই সংগে হঠাৎ তার সাথে আমাদের এমন ব্যবহার করা উচিত নয় যা একমাত্র চুক্তি না থাকা অবস্থায় করা যেতে পারে৷ বরং এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হলে কোন বিরোধীতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করার আগে দ্বিতীয় পক্ষকে স্পষ্টভাবে একথা জানিয়ে দেবার জন্যে আমাদের তাগিদ দেয়া হয়েছে যে, আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এখন আর কোন চুক্তি নেই৷ এভাবে চুক্তি ভংগ করার জ্ঞান আমরা যতটুকু অর্জন করেছি তারাও ততটুকু অর্জন করতে পারবে এবং চুন্তি কখনো অপরিবর্তিত আছে এ ধরনের ভূল ধারণা তারা পোষণ করবে না৷ আল্লাহর এ ফরমান অনুযায়ী নবী (সা) ইসলামের আন্তির্জাতিক রাজনীতির নিম্নোক্ত স্থায়ী মূলনীতি ঘোষনা করছিলেনঃ
-------------------------- ----
"কোন জাতির সাথে কারোর কোন চুক্তি থাকলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার আগে তার চুক্তি লংঘন করা উচিত নয়৷ এক পক্ষ চুক্তি ভংগ করলে উভয় পক্ষের সমতার ভিত্তিতে অপর পক্ষ চুক্তি বাতিল করার কথা জানাতে পারে" ৷
তারপর এ নিয়মকে তিনি আরো একটু ব্যাপকভিত্তিক করে সমস্ত ব্যাপারে এ সাধারণ নীতি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেনঃ --------(যে ব্যক্তি তোমরা সাথে খেয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করে তুমি তার সাথে খেয়ানত করো না)এ নীতিটি শুধুমাত্র বক্তৃতা বিবৃতিতে বলার ও বইয়ের শোভা বর্ধনের জন্যে ছিল না বরং বাস্তব জীবনে একে পুরোপুরি মেনে চলা হতো৷ আমীর মুআবীয়া (রা) একবার নিজের রাজত্বকালে রোম সাম্রাজ্যের সীমান্তে সেনা সমাবেশ করতে শুরু করেন৷ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার সাথে সাথেই অতর্কিতে রোমান এলাকায় আক্রমণ চালাবেন৷ তাঁর এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রসূলের (সা)সাহাবী আমর ইবনে আমবাসা (রা) কঠোর প্রতিবাদ জানান৷ তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ হাদীসটি শুনিয়েই চুক্তির মেয়াদের মধ্যেই এ ধরনের শত্রুতামূলক কার্যকলাপকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে অবিহিত করেন৷ অবশেষে আমীর মু'আবীয়াকে এ নীতির সামনে মাথা নোয়াতে হয় এবং তিনি সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ বন্ধ করে দেন৷
একতরফাভাবে চুক্তি ভংগ ও যুদ্ধ ঘোষনা করা ছাড়া আক্রমণ করার পদ্ধতি প্রাচীন জাহেলী যুগেও ছিল এবং বর্তমান যুগের সুসভ্য জাহিলিয়াতেও এর প্রচলন আছে৷ এর নতুনতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে বিগত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রাশিয়ার ওপর জার্মানীর আক্রমণ৷ এবং ইরানের বিরুদ্ধে রাশিয়া ও বৃটেনের সামরিক কার্যক্রম৷ সাধারণত এ ধরনের কার্যক্রমের স্বপক্ষে এ ওযর পেশ করা হয় যে, আক্রমণের পূর্বে জানিয়ে দিলে প্রতিপক্ষ সতর্ক হয়ে যায়৷এ অবস্থায় কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয় অথবা যদি আমরা অগ্রসর হয়ে হস্তক্ষেপ না করতাম তাহলে আমাদের শত্রুরা সুবিধা লাভ করতো৷ কিন্তু নৈতিক দায়িত্ব পালন থেকে অব্যহতি লাভের জন্যে এ ধরনের বাহানাকে যদি যথেষ্ট মনে করা হয় তাহলে দুনিয়ায় আর এমন কোন অপরাধ থাকে না যা কোন না কোন বাহানায় করা যেতে পারে না৷প্রত্যেক চোর,ডাকাত, ব্যভিচারী, ঘাতক, ও জালিয়াত নিজের অপরাধের জন্যে এমনি ধরনের কোন না কোন কারণ দর্শাতে পারে৷ অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, আন্তরজাতিক পরিবেশে এরা একটি জাতির জন্যে এমন অনেক কাজ বৈধ মনে করে যা জাতীয় পরিবেশে কোন ব্যক্তি বিশেষ করলে তাদের দৃষ্টিতে অবৈধ বলে গণ্য হয়৷
এ প্রসংগে একথা জেনে নেয়ারও প্রয়োজন যে, ইসলামী আইন শুধুমাত্র একটি অবস্থায় পূর্ব ঘোষণা আক্রমণ করা বৈধ গণ্য করে৷ সে অবস্থাটি হচ্ছে, দ্বিতীয় পক্ষ যখন ঘোষণা দিয়েই চুক্তি ভংগ করে এবং আমাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে শত্রুতামূলক কাজ করে৷ এহেন অবস্থায় উল্লেখিত আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের পক্ষ থেকে তার কাছে চুক্তি ভংগ করার নোটিশ দেবার প্রয়োজন হয় না৷ বরং আমরা অঘোষিতভাবে তার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার অধিকার লাভ করি৷বনী খুযাআর ব্যাপারে কুরাইশরা যখন হুদাইবিয়ার চুক্তি প্রকাশ্যে ভংগ করে তখন নবী (সা) তাদেরকে চুক্তি ভংগ করার নোটিশ দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি এবং কোন প্রকার ঘোষনা না দিয়েই মক্কা আক্রমণ করে বসেন৷ নবী (সা) এর এ কার্যক্রম থেকেই মুসলিম ফকীহগণ এ ব্যতিক্রমধর্মী বিধি রচনা করেছেন৷ কিন্তু কোন অবস্থায় যদি আমরা এ ব্যতিক্রমধর্মী নিয়ম থেকে ফায়দা উঠাতে চাই তাহলে অবশ্যি সেই সমস্ত অবস্থা আমাদের সামনে থাকতে হবে যে অবস্থায় নবী (সা) এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন৷ এভাবে তাঁর সমগ্র কার্যক্রমের একটি সুবিধাজনক অংশ মাত্রের অনুসরণ না করে তার সবটুকুর অনুসরণ করা হবে৷হাদীস ও সীরাতের কিতাবগুলো থেকে যা কিছু প্রমাণিত হয় তা হচ্ছে নিম্নরূপঃ
একঃ কুরাইশদের চুক্তি ভংগের ব্যাপারটি এত বেশী সুষ্পষ্ট ছিল যে, তারা যে চুক্তি ভংগ করেছে এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করার কোন সুযোগ ছিল না৷ কুরাইশরা এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকেরা নিজেরাও চুক্তি যথার্থই ভেঙে গেছে বলে স্বীকার করতো৷ তারা নিজেরাই চুক্তি নবায়নের জন্যে আবু সুফিয়ানকে মদীনায় পাঠিয়েছিল৷ এর পরিস্কার অর্থ ছিল , তাদের দৃষ্টিতেও চুক্তি অক্ষুন্ন ছিল না৷ তবুও চুক্তি ভংগকারী জাতি নিজেই চুক্তি ভঙ্গ করার কথা স্বীকার করবে, এটা জরুরী না৷ তবে চুক্তি ভংগ করার ব্যাপারটি একেবারে সুষ্পষ্ট ও সন্দেহাতীত হওয়া অবশ্যি জরুরী৷
দুইঃ কুরাইশদের পক্ষ থেকে চুক্তি ভংগ করার পরও নবী (সা) নিজের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বা ইশারা ইঙ্গিতে এমন কোন কথা বলেননি যা থেকে এ ইশারা পাওয়া যায় যে, এ চুক্তি ভংগ করা সত্ত্বেও তিনি এখানো তাদেরকে একটি চুক্তিবদ্ধ জাতি মনে করেন এবং এখনো তাদের সাথে তাঁর চুক্তিমূলক সম্পর্ক বজায় রয়েছে বলে মনে করেন৷ সমস্ত বর্ণনা একযোগে একথা প্রমাণ করে যে, আবু সুফিয়ান যখন মদীনায় এসে চুক্তি নবায়নের আবেদন করে তখন তিনি তা গ্রহণ করেননি৷
তিনঃ তিনি নিজে কুরাইশদের বিরুদ্ধে সামরিক কার্যক্রম গ্রহণ করেন এবং প্রকাশ্যে গ্রহণ করেন৷ তাঁর কার্যক্রমে কোন প্রকার প্রতারণার সামান্যমত গন্ধও পাওয়া যায় না৷ তিনি বাহ্যত সন্ধি এবং গোপনে যুদ্ধের পথ অবলম্বন করেননি৷
এটিই এ ব্যাপারে নবী (সা) এর উত্তম আদর্শ৷ কাজেই ওপরে উল্লেখিত আয়াতের সাধারণ বিধান থেকে সরে গিয়ে যদি কোন কার্যক্রম অবলম্বন করা যেতে পারে তাহলে তা এমনি বিশেষ অবস্থায়ই করা যেতে পারে এবং নবী (সা) যে ধরনের সরল-সহজ-ভদ্রজনোচিত পথে তা করেছিলেন তেমনি পথেই করা যেতে পারে৷
তাছাড়া কোন চুক্তিবদ্ধ জাতির সাথে কোন বিষয়ে যদি আমাদের কোন বিবাদ সৃষ্টি হয়ে যায় এবং আমরা দেখি পারষ্পরিক আলাপ আলোচনা বা আন্তর্জাতিক সালিশের মাধ্যমে এ বিবাদের মীমাংসা হচ্ছে না অথবা যদি আমরা দেখি, দ্বিতীয় পক্ষ বল প্রয়োগ করে এর মীমাংসা করতে উঠে পড়ে লেগেছে, তাহলে এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য বল প্রয়োগ করে এর মীমাংসায় পৌছানো সম্পূর্ণরূপে বৈধ হয়ে যাবে৷ কিন্তু উপরোক্ত আয়াত আমাদের ওপর এ নৈতিক দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের এ বল প্রয়োগ পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণার পর হতে হবে এবং তা হতে হবে প্রকাশ্যে৷ লুকিয়ে লুকিয়ে গোপনে এমন ধরনের সামারিক কার্যক্রম করা যার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে আমরা প্রস্তুত নই, একটি অসদাচার ছাড়া আর কিছুই নয়৷ইসলাম এর শিক্ষা আমাদের দেয়নি৷
__________________________ ________________________
৫৯) সত্য অস্বীকারকারীরা যেন এ ভূল ধারণা ও পোষণ না করে যে,তারা জিতে গেছে৷ নিশ্চয়ই তারা আমাকে হারাতে পারবে না৷
__________________________ ________________________
৫৬) বিশেষ করে তাদের মধ্যে থেকে এমন সব লোক যাদের সাথে তুমি চুক্তি করছো তারপর তারা প্রত্যেকবার তা ভংগ করে এবং একটুও আল্লাহর ভয় করে না৷ *৪১
__________________________
*৪১ . এখানে বিশেষভাবে ইহুদীদের প্রতি ইশারা করা হয়েছে৷ মদীনা তাইয়েবায় আসার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম তাদের সাথেই সৎ প্রতিবেশী সূলভ জীবন যাপন ও পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার চুক্তি করেছিলেন ৷ তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্যে তিনি নিজের সামর্থ অনুযায়ী পূর্ণ প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন৷ তাছাড়া ধর্মীয় দিক দিয়েও তিনি ইহুদীদেরকে মুশরিকদের তুলনায় নিজের অনেক কাছের মনে করতেন, প্রত্যেক ব্যাপারেই তিনি মুশরিকদের মোকাবিলায় আহলি কিতাবদের মত ও পথকে অগ্রাধিকার দিতেন৷ কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ভেজাল তাওহীদ ও সৎ চরিত্র নীতি সংক্রান্ত যেসব কথা প্রচার করে চলছিলেন , বিশ্বাস ও কর্মের গোমরাহীর বিরুদ্ধে যে সমালোচনা করে চলছিলেন এবং সত্য দীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যে প্রচেষ্ঠা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন ইহুদীদের উলামা ও মাশায়েখ গোষ্ঠী তা একটুও পছন্দ করতে না৷ এ নতুন আন্দোলন যাতে কোনভাবেই সাফল্য লাভ করতে না পারে সে জন্যে তারা অনবরত ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিল৷ এ উদ্দেশ্যে তারা মদীনার মুনাফিক মুসলমানদের সাথে মিলে চক্রান্ত করে চলছিল৷এ উদ্দেশ্যেই তারা আওস ও খাযরাজ বংশীয় লোকদের যেসব পুরাতন শত্রুতা ইসলাম পূর্বযুগে তাদের মধ্যে খুনাখুনি ও হানাহানির কারণ হতো সেগুলোকে উৎসাহিত ও উত্তেজিত করতো৷ এ উদ্দেশ্যেই কুরাইশ ও অন্যান্য ইসলাম বিরোধী গোত্রগুলোর সাথে তাদের গোপন যোগসাজস চলছিল৷ নবী (সা) ও তাদের মধ্যে যে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তা সত্ত্বেও এসব কাজ করে চলছিল৷ যখন বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হলো, শুরুতে তারা আশা করেছিল, কুরাইশদের প্রথম আঘাতেই এই আন্দোলনের মৃত্যু ঘন্টা বেজে উঠবে৷ কিন্তু ফলাফল দেখা গেলো তাদের প্রত্যাশার বিপরীত ৷ এ অবস্থায় তাদের অন্তরে আরো বেশী করে জ্বলে উঠলো হিংসার আগুন৷ বদরের বিজয় যাতে ইসলামের শক্তিতে একটি স্থায়ী বিপদে পরিণত না করে দেয় এ আশংকায় তারা নিজেদের বিরোধামূলক প্রচেষ্টা আরো বেশী জোরদার করে দিল৷ এমনকি একজন নেতা কা'ব ইবনে আশরাফ(কুরাইশদের পরাজয়ের খবর শুনে যে ব্যক্তি চিৎকার করে বলে উঠেছিল,আজ যমীনের পেট তার পিঠের চেয়ে আমাদের জন্যে অনেক ভাল)নিজে মক্কা গেলো৷ সেখানে সে উদ্দীপনাময় শোক গীতি গেয়ে কুরাইশদের অন্তরে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগিয়ে তুলতে থাকলো৷ এখানেই তারা ক্ষান্ত হলো না৷ ইহুদীদের বনী কাইনুকা গোত্র সৎ প্রতিবেশী সূলভ বসবাসের চুক্তি ভংগ করে তাদের জনবসতিতে যেসব মুসলমান মেয়ে কোন কাজে যেতো তাদেরকে উত্যক্ত ও উৎপীড়ন করতে শুরু করলো৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাদের এ অন্যায় কার্যকলাপের জন্যে তাদের তিরস্কার করলেন তখন তারা জবাবে হুমকি দিলঃ "আমাদের মক্কার কুরাইশ মনে করো না৷ আমরা যুদ্ধ করতেও যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণ দিতে জানি৷ আমাদের মোকাবিলায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে নামলে তোমরা টের পাবে, পুরুষ কাকে বলে ৷"
__________________________
৫৭) কাজেই এ লোকদের যদি তোমরা যুদ্ধের মধ্যে পাও তাহলে তাদের এমনভাবে মার দেবে যেন তাদের পরে অন্য যারা এমনি ধরনের আচরণ করতে চাইবে তারা দিশা হারিয়ে ফেলে৷ *৪২ আশা করা যায় ,চুক্তি ভংগকারীদের এ পরিণাম থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করবে৷
__________________________
*৪২ . এর অর্থ হচ্ছে, যদি কোন জাতির সাথে আমাদের চুক্তি হয়, তারপর তারা নিজেদের চুক্তির দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে আমরাও চুক্তির নৈতিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবো৷ এ ক্ষেত্রে আমরাও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ন্যায়সংগত অধিকার লাভ করবো৷ তাছাড়া যদি কোন জাতির সাথে আমাদের যুদ্ধ চলতে থাকে এবং আমরা দেখি ,শত্রুপক্ষের সাথে এমন এক সম্প্রদায়ের লোকরাও যুদ্ধে শামিল হয়েছে যাদের সাথে আমাদের চুক্তি রয়েছে তাহলে আমরা তাদেরকে হত্যা করতে এবং তাদের সাথে শত্রুর মত ব্যবহার করতে একটুও দ্বিধা করবো না৷কারণ তারা ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের সম্প্রদায়ের চুক্তি ভংগ করে তাদের ধন-প্রাণের নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের সম্প্রদায়ের সাথে আমাদের যে চুক্তি রয়েছে তা লংঘন করেছে৷ ফলে নিজেদের নিরাপত্তার অধিকার তারা প্রমাণ করতে পারেনি৷
__________________________
৫৮) আর যদি কখনো কোন জাতির পক্ষ থেকে তোমাদের খেয়ানত আশংকা থাকে তাহলে তার চুক্তি প্রকাশ্যে তার সামনে ছুড়ে দাও৷ *৪৩ নিসন্দেহে আল্লাহ খেয়ানতকারীকে পছন্দ করেন না৷
__________________________
*৪৩ . এ আয়াতের দৃষ্টিতে যদি কোন ব্যক্তি,দল বা দেশের সাথে আমাদের চুক্তি থাকে এবং তার কর্মনীতি আমাদের মনে তার বিরুদ্ধে চুক্তি মেনে চলার ব্যাপারে গড়িমসি করার অভিযোগ সৃষ্টি করে অথবা সুযোগ পেলেই সে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে এ ধরনের আশংকা দেখা দেয়, তাহলে আমাদের পক্ষে একতরফাভাবে এমন সিদ্ধান্ত হঠাৎ কোনক্রমেই বৈধ নয় যে, আমাদের ও তার মধ্যে কোন চুক্তি নেই৷ আর এই সংগে হঠাৎ তার সাথে আমাদের এমন ব্যবহার করা উচিত নয় যা একমাত্র চুক্তি না থাকা অবস্থায় করা যেতে পারে৷ বরং এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হলে কোন বিরোধীতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করার আগে দ্বিতীয় পক্ষকে স্পষ্টভাবে একথা জানিয়ে দেবার জন্যে আমাদের তাগিদ দেয়া হয়েছে যে, আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এখন আর কোন চুক্তি নেই৷ এভাবে চুক্তি ভংগ করার জ্ঞান আমরা যতটুকু অর্জন করেছি তারাও ততটুকু অর্জন করতে পারবে এবং চুন্তি কখনো অপরিবর্তিত আছে এ ধরনের ভূল ধারণা তারা পোষণ করবে না৷ আল্লাহর এ ফরমান অনুযায়ী নবী (সা) ইসলামের আন্তির্জাতিক রাজনীতির নিম্নোক্ত স্থায়ী মূলনীতি ঘোষনা করছিলেনঃ
--------------------------
"কোন জাতির সাথে কারোর কোন চুক্তি থাকলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার আগে তার চুক্তি লংঘন করা উচিত নয়৷ এক পক্ষ চুক্তি ভংগ করলে উভয় পক্ষের সমতার ভিত্তিতে অপর পক্ষ চুক্তি বাতিল করার কথা জানাতে পারে" ৷
তারপর এ নিয়মকে তিনি আরো একটু ব্যাপকভিত্তিক করে সমস্ত ব্যাপারে এ সাধারণ নীতি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেনঃ --------(যে ব্যক্তি তোমরা সাথে খেয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করে তুমি তার সাথে খেয়ানত করো না)এ নীতিটি শুধুমাত্র বক্তৃতা বিবৃতিতে বলার ও বইয়ের শোভা বর্ধনের জন্যে ছিল না বরং বাস্তব জীবনে একে পুরোপুরি মেনে চলা হতো৷ আমীর মুআবীয়া (রা) একবার নিজের রাজত্বকালে রোম সাম্রাজ্যের সীমান্তে সেনা সমাবেশ করতে শুরু করেন৷ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার সাথে সাথেই অতর্কিতে রোমান এলাকায় আক্রমণ চালাবেন৷ তাঁর এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রসূলের (সা)সাহাবী আমর ইবনে আমবাসা (রা) কঠোর প্রতিবাদ জানান৷ তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ হাদীসটি শুনিয়েই চুক্তির মেয়াদের মধ্যেই এ ধরনের শত্রুতামূলক কার্যকলাপকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে অবিহিত করেন৷ অবশেষে আমীর মু'আবীয়াকে এ নীতির সামনে মাথা নোয়াতে হয় এবং তিনি সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ বন্ধ করে দেন৷
একতরফাভাবে চুক্তি ভংগ ও যুদ্ধ ঘোষনা করা ছাড়া আক্রমণ করার পদ্ধতি প্রাচীন জাহেলী যুগেও ছিল এবং বর্তমান যুগের সুসভ্য জাহিলিয়াতেও এর প্রচলন আছে৷ এর নতুনতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে বিগত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রাশিয়ার ওপর জার্মানীর আক্রমণ৷ এবং ইরানের বিরুদ্ধে রাশিয়া ও বৃটেনের সামরিক কার্যক্রম৷ সাধারণত এ ধরনের কার্যক্রমের স্বপক্ষে এ ওযর পেশ করা হয় যে, আক্রমণের পূর্বে জানিয়ে দিলে প্রতিপক্ষ সতর্ক হয়ে যায়৷এ অবস্থায় কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয় অথবা যদি আমরা অগ্রসর হয়ে হস্তক্ষেপ না করতাম তাহলে আমাদের শত্রুরা সুবিধা লাভ করতো৷ কিন্তু নৈতিক দায়িত্ব পালন থেকে অব্যহতি লাভের জন্যে এ ধরনের বাহানাকে যদি যথেষ্ট মনে করা হয় তাহলে দুনিয়ায় আর এমন কোন অপরাধ থাকে না যা কোন না কোন বাহানায় করা যেতে পারে না৷প্রত্যেক চোর,ডাকাত, ব্যভিচারী, ঘাতক, ও জালিয়াত নিজের অপরাধের জন্যে এমনি ধরনের কোন না কোন কারণ দর্শাতে পারে৷ অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, আন্তরজাতিক পরিবেশে এরা একটি জাতির জন্যে এমন অনেক কাজ বৈধ মনে করে যা জাতীয় পরিবেশে কোন ব্যক্তি বিশেষ করলে তাদের দৃষ্টিতে অবৈধ বলে গণ্য হয়৷
এ প্রসংগে একথা জেনে নেয়ারও প্রয়োজন যে, ইসলামী আইন শুধুমাত্র একটি অবস্থায় পূর্ব ঘোষণা আক্রমণ করা বৈধ গণ্য করে৷ সে অবস্থাটি হচ্ছে, দ্বিতীয় পক্ষ যখন ঘোষণা দিয়েই চুক্তি ভংগ করে এবং আমাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে শত্রুতামূলক কাজ করে৷ এহেন অবস্থায় উল্লেখিত আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের পক্ষ থেকে তার কাছে চুক্তি ভংগ করার নোটিশ দেবার প্রয়োজন হয় না৷ বরং আমরা অঘোষিতভাবে তার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার অধিকার লাভ করি৷বনী খুযাআর ব্যাপারে কুরাইশরা যখন হুদাইবিয়ার চুক্তি প্রকাশ্যে ভংগ করে তখন নবী (সা) তাদেরকে চুক্তি ভংগ করার নোটিশ দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি এবং কোন প্রকার ঘোষনা না দিয়েই মক্কা আক্রমণ করে বসেন৷ নবী (সা) এর এ কার্যক্রম থেকেই মুসলিম ফকীহগণ এ ব্যতিক্রমধর্মী বিধি রচনা করেছেন৷ কিন্তু কোন অবস্থায় যদি আমরা এ ব্যতিক্রমধর্মী নিয়ম থেকে ফায়দা উঠাতে চাই তাহলে অবশ্যি সেই সমস্ত অবস্থা আমাদের সামনে থাকতে হবে যে অবস্থায় নবী (সা) এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন৷ এভাবে তাঁর সমগ্র কার্যক্রমের একটি সুবিধাজনক অংশ মাত্রের অনুসরণ না করে তার সবটুকুর অনুসরণ করা হবে৷হাদীস ও সীরাতের কিতাবগুলো থেকে যা কিছু প্রমাণিত হয় তা হচ্ছে নিম্নরূপঃ
একঃ কুরাইশদের চুক্তি ভংগের ব্যাপারটি এত বেশী সুষ্পষ্ট ছিল যে, তারা যে চুক্তি ভংগ করেছে এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করার কোন সুযোগ ছিল না৷ কুরাইশরা এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকেরা নিজেরাও চুক্তি যথার্থই ভেঙে গেছে বলে স্বীকার করতো৷ তারা নিজেরাই চুক্তি নবায়নের জন্যে আবু সুফিয়ানকে মদীনায় পাঠিয়েছিল৷ এর পরিস্কার অর্থ ছিল , তাদের দৃষ্টিতেও চুক্তি অক্ষুন্ন ছিল না৷ তবুও চুক্তি ভংগকারী জাতি নিজেই চুক্তি ভঙ্গ করার কথা স্বীকার করবে, এটা জরুরী না৷ তবে চুক্তি ভংগ করার ব্যাপারটি একেবারে সুষ্পষ্ট ও সন্দেহাতীত হওয়া অবশ্যি জরুরী৷
দুইঃ কুরাইশদের পক্ষ থেকে চুক্তি ভংগ করার পরও নবী (সা) নিজের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বা ইশারা ইঙ্গিতে এমন কোন কথা বলেননি যা থেকে এ ইশারা পাওয়া যায় যে, এ চুক্তি ভংগ করা সত্ত্বেও তিনি এখানো তাদেরকে একটি চুক্তিবদ্ধ জাতি মনে করেন এবং এখনো তাদের সাথে তাঁর চুক্তিমূলক সম্পর্ক বজায় রয়েছে বলে মনে করেন৷ সমস্ত বর্ণনা একযোগে একথা প্রমাণ করে যে, আবু সুফিয়ান যখন মদীনায় এসে চুক্তি নবায়নের আবেদন করে তখন তিনি তা গ্রহণ করেননি৷
তিনঃ তিনি নিজে কুরাইশদের বিরুদ্ধে সামরিক কার্যক্রম গ্রহণ করেন এবং প্রকাশ্যে গ্রহণ করেন৷ তাঁর কার্যক্রমে কোন প্রকার প্রতারণার সামান্যমত গন্ধও পাওয়া যায় না৷ তিনি বাহ্যত সন্ধি এবং গোপনে যুদ্ধের পথ অবলম্বন করেননি৷
এটিই এ ব্যাপারে নবী (সা) এর উত্তম আদর্শ৷ কাজেই ওপরে উল্লেখিত আয়াতের সাধারণ বিধান থেকে সরে গিয়ে যদি কোন কার্যক্রম অবলম্বন করা যেতে পারে তাহলে তা এমনি বিশেষ অবস্থায়ই করা যেতে পারে এবং নবী (সা) যে ধরনের সরল-সহজ-ভদ্রজনোচিত পথে তা করেছিলেন তেমনি পথেই করা যেতে পারে৷
তাছাড়া কোন চুক্তিবদ্ধ জাতির সাথে কোন বিষয়ে যদি আমাদের কোন বিবাদ সৃষ্টি হয়ে যায় এবং আমরা দেখি পারষ্পরিক আলাপ আলোচনা বা আন্তর্জাতিক সালিশের মাধ্যমে এ বিবাদের মীমাংসা হচ্ছে না অথবা যদি আমরা দেখি, দ্বিতীয় পক্ষ বল প্রয়োগ করে এর মীমাংসা করতে উঠে পড়ে লেগেছে, তাহলে এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য বল প্রয়োগ করে এর মীমাংসায় পৌছানো সম্পূর্ণরূপে বৈধ হয়ে যাবে৷ কিন্তু উপরোক্ত আয়াত আমাদের ওপর এ নৈতিক দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের এ বল প্রয়োগ পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণার পর হতে হবে এবং তা হতে হবে প্রকাশ্যে৷ লুকিয়ে লুকিয়ে গোপনে এমন ধরনের সামারিক কার্যক্রম করা যার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে আমরা প্রস্তুত নই, একটি অসদাচার ছাড়া আর কিছুই নয়৷ইসলাম এর শিক্ষা আমাদের দেয়নি৷
__________________________
৫৯) সত্য অস্বীকারকারীরা যেন এ ভূল ধারণা ও পোষণ না করে যে,তারা জিতে গেছে৷ নিশ্চয়ই তারা আমাকে হারাতে পারবে না৷
__________________________
Tafhimul Quran's Notes
সূরা আল আসর : 'সময়' এর সুরা...Dec 31, 2009
সুরা ইউনুস (আয়াত ৬৮-৭০) : মারঈয়ামপূত্র ইশা আ: কেবল-ই আল্লাহর রাসুল ! আল্লাহ মহান ও পবিত্র !Dec 27, 2009
সুরা আনফাল (৫৫ থেকে ৫৯) : চুক্তি-ভঙ্গ - বিশ্বাসঘাতকতা ও যুদ্ধের ক্ষেত্রে খিয়ানত বিষয়ক নীতিমালা...Dec 22, 2009
সুরা ইউনুস (আয়াত ৪৭-৫৬) : আল্লাহর আযাব এসে যাবার পরে আর কিছু করার থাকবেনা , আল্লাহ তো কম সাবধান করছেন না !!!Nov 20, 2009
সুরা ইউনুস (আয়াত ৪১-৪৬) : নিজের পরিনতির জন্য মানুষ কিছুতেই নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দায়ী করতে পারবেনা !Nov 12, 2009
















